বিশ্বকাপ আসলেই বাংলাদেশে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা অন্য কোনো দেশের সমর্থকরা নিজেদের দলের জন্য এমন আবেগ দেখান, যেন এটি শুধুমাত্র একটি খেলা নয়, বরং বিশ্বাসের একটি বিষয়।
অনেকেই কোনো দলকে সমর্থন করেন কারণ তাদের বাবা, দাদা বা পরিবারের অন্য সদস্যরা সেই দলকে সমর্থন করতেন। কেন সমর্থন করেন, সেই প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত উত্তর অনেক সময় থাকে না। শুধু বলা হয়, "বাপ-দাদা যেটা করেছে, আমিও সেটাই করছি।"
ধর্মের ক্ষেত্রে মানুষ তার বিশ্বাস, নীতি ও জীবনব্যবস্থা অনুসরণ করে। কিন্তু আজকাল দেখা যাচ্ছে, অনেকেই ফুটবল দল নিয়ে এমন তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া ও শত্রুতা করছেন, যেন দলটাই তাদের পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ হয়ে গেছে। বিশাল বিশাল পতাকা, ব্যানার, পোস্টার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালাগালি, এমনকি মারামারি পর্যন্ত হচ্ছে।
একটু ভেবে দেখুন, আমরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান যাই হই না কেন, আমাদের নিজ নিজ ধর্ম আমাদের শিখিয়েছে শান্তি, সহনশীলতা ও মানবতার কথা। কিন্তু বিদেশের কোনো ফুটবল দলের জন্য আমরা প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া করছি, বন্ধুত্ব নষ্ট করছি, কখনো কখনো সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ছি।
যে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বা জার্মানির জন্য আমরা এত উত্তেজিত, তারা আমাদের চেনে না। আমাদের ঝগড়া, আমাদের শত্রুতা বা আমাদের মারামারি তাদের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না। অথচ আমাদের সমাজে অসংখ্য বাস্তব সমস্যা রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আমরা অনেক কম কথা বলি।
ফুটবল ভালোবাসা দোষের নয়। খেলা মানুষকে আনন্দ দেয়, বিনোদন দেয়, একত্রিত করে। কিন্তু যখন একটি খেলা মানুষের বিবেক, যুক্তি ও পারস্পরিক সম্মানের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন সেটি আর শুধু খেলা থাকে না।
তাই আসুন, আমরা ফুটবলকে ভালোবাসি, কিন্তু তাকে ধর্মের মতো অন্ধ আনুগত্যের জায়গায় না বসাই। নিজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও মানবিকতাকে সবার আগে রাখি। কারণ একজন ভালো মানুষ হওয়া কোনো ফুটবল দলের সমর্থক হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দল বদলালে কিছু যায় আসে না, কিন্তু মানবতা হারিয়ে গেলে সবকিছু হারিয়ে যায়।
Comments
Post a Comment