ভাওয়াইয়া রংপুরের মাটির সুর, যা আজ বিলুপ্তির পথে।
রংপুরের আকাশে এক সময় সন্ধ্যা নামলেই ভেসে আসত সুর—
“ও কে বাঁশি বাজায় রে… মন পাগল করে…”
এ ছিল রংপুরের প্রাণের গান — ভাওয়াইয়া।
এ গান শুধু গান নয়, এ ছিল উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, প্রেম, দুঃখ, রোদ-বৃষ্টি আর মাঠের মাটির গন্ধে মিশে থাকা এক আখ্যান।
কিন্তু আজ?
রংপুরের সেই প্রাণের সুর যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের ভাঁজে।
যে ভাওয়াইয়া এক সময় রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম থেকে শুরু করে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি পর্যন্ত বয়ে যেত, আজ তা কেবল স্মৃতির খাতায়।
বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে হাজার রকম সাংস্কৃতিক উৎসব হয়, কিন্তু ভাওয়াইয়ার জন্য আলাদা কোনো প্রজেক্ট, কোনো একাডেমি, এমনকি টেকনিক্যাল সংরক্ষণ উদ্যোগও নেই।
যেখানে ভারতের রাজবংশি সমাজ আজও ভাওয়াইয়া নিয়ে গবেষণা করছে, সংরক্ষণ করছে, সেখানে বাংলাদেশের রংপুরেই এই গান আজ পরিত্যক্ত।
ভাওয়াইয়া ছিল কৃষকের, রাখালের, গরুর গাড়িওয়ালার গান।
এই গানেই ছিল তাদের প্রেম, তাদের শ্রম, তাদের সমাজ আর জীবনের বেদনা।
আজকের প্রজন্মের কাছে ভাওয়াইয়া এক অচেনা নাম, অথচ এই গানেই আমাদের সংস্কৃতির শেকড়।
যে জাতি নিজের শেকড় ভুলে যায়, সে জাতি তার পরিচয়ও হারায়।
রংপুরের মানুষ আজও যখন এই গান শুনে—
“ওগো প্রিয়া, তুমি কোথায় রে…”
তখন বুকের ভেতর একটা অজানা কষ্ট বাজে।
এই গান আমাদের দুঃখে সান্ত্বনা দেয়, আবার আনন্দে মিশে যায়।
এখন সময় এসেছে, রংপুরের মানুষকে এই ভাওয়াইয়া ফেরানোর।
সরকার নয়, আমরা নিজেরাই যদি এই গানটাকে আবার নতুন করে বাঁচাই—
তাহলেই হয়তো একদিন আবার রংপুরের হাওয়ায় বাজবে সেই হারানো বাঁশির সুর।
ভাওয়াইয়া কেবল একটি গান নয়,
এ আমাদের পরিচয়,
আমাদের ইতিহাস,
আমাদের মাটির গন্ধ।
একে ভুলে যাওয়া মানে নিজের অস্তিত্ব হারানো।
0 Comments